পারিজাত
পারিজাত
  • মূলপাতা
  • চিত্রকলা
  • ভ্রমন
  • অন্যান্য
    • অন্দরমহল
      • রান্নাঘর
      • নারীর জগৎ
      • শিশুর জগৎ
    • বইপত্র
    • সঙ্গীত
    • ছবির জগৎ
    • গল্পকথা
  • যোগাযোগ

ছবির জগৎ

স্ব-উন্নয়ন

রান্নাঘর



 কেরালার ম্যুরাল — "লক্ষ্মী-নারায়ন"

"ম্যুরাল" শব্দটির এক কথায় অর্থ হল " দেওয়াল চিত্র" বা " দেওয়াল অঙ্কন" ।"ম্যুরাল" শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ "মুরুস" থেকে, যার অর্থ দেওয়াল (wall) ।

ম্যুরাল হল এমন এক চিত্রকলা, যা দেওয়াল, ছাদ বা অন্যান্য স্থায়ী পৃষ্ঠতলগুলিতে আঁকা হয় বা সরাসরি প্রয়োগ করা হয়। ম্যুরাল চিত্রকলার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল প্রদত্ত স্থানটির স্থাপত্য উপাদানগুলি সাদৃশ্যপূর্ণভাবে ছবিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সাধারনত দেওয়ালে সরাসরি অঙ্কিত চিত্রকলাকে ম্যুরাল বলা হলেও, ঊনবিংশ শতকের শেষ থেকে বড় ক্যানভাসে চিত্র অঙ্কন করে পরে তা দেওয়ালে প্লাস্টার বা সিমেন্টের সাহায্যে স্থায়ীভাবে জুড়ে পরপর সংযুক্ত করা হয়, এই কৌশলকে "ম্যারোফ্লেজ" ( Marouflage) বলে।

ইতিহাসঃ

প্রাগৈতিহাসিক সময়ে গুহাচিত্রের সন্ধান পাওয়া যায় যা বর্তমানকালে ম্যুরাল চিত্রকলার পূর্বসূরিরূপে গন্য করা হয়। সেই সময় গুহাবাসী মানুষ পাথরের গায়ে আঁচড় কেটে বা খোদাই করে নিজেদের জীবনযাত্রার বিভিন্ন চিহ্ন এঁকে গেছেন যা ইতিহাসের এক অমুল্য সম্পদ। এই সমস্ত গুহাচিত্র থেকে সেই সময়কার দৈনন্দিন জীবনশৈলী, রীতিনীতি, ধর্মীয় বিশ্বাস প্রভৃতির সম্পর্কে বিভিন্ন তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য থেকে ভিন্ন ভিন্ন যুগের সম্বন্ধে আমরা ধারনা পেয়ে থাকি।

এখনও পর্যন্ত যত দেওয়াল চিত্র পাওয়া গেছে তাদের সময়কাল হিসাব করে দেখা গেছে যে প্রস্তরযুগের অন্তিম সময় থেকে এর অস্তিত্ব ছিল।

যেমন বোর্নিওর লুবাং জেরিজি সালেহ গুহার দেওয়ালে ৪০,০০০-৫২,০০০ বছর আগের গুহাচিত্র পাওয়া গেছে। এই গুহাচিত্রটি ( বলদে আকৃতি) এখনও অবধি প্রাপ্ত ম্যুরালের মধ্যে প্রাচীনতম হিসাবে ধরা হয়।

দক্ষিণ ফ্রান্সের আর্ডেশ বিভাগের শভেট গুহার চিত্র ( এক দল গণ্ডার) প্রায় ৩২০০০ বছর আগের।

প্রায় ৩১৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রাচীন মিশরের সমাধির মধ্যে অনেক প্রাচীন ম্যুরাল পাওয়া গেছে।

ফ্যারাও তুতেনখামেনের সমাধিতে প্রাপ্ত দেওয়ালচিত্র।

এছাড়াও মধ্যযুগে তৃতীয় ১৭০০–১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) মিনোয়ান রাজবাড়ীতে ,অক্সটোশিটলান গুহায় চিত্র পাওয়া গেছে।

প্রায় ১২০০-৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেক্সিকোর জুক্সটলাহুয়াকা পাওয়া ম্যুরাল।

রোমান সভ্যতায় ম্যুরাল এক অন্যমাত্রা যোগ করে। সেই যুগের সমস্ত স্থাপত্যে এই চিত্রকলার নিদর্শন পাওয়া যায়। বিশেষত পম্পেই এবং অষ্টিয়ার সমস্ত ভবনে প্রাকৃতিক, স্থির জীবন ও মূর্ত দৃশ্যাবলীর অপরূপ সমাহার দেখতে পাওয়া যায়। পম্পেই-এর কাসা-দে-কাস্তি-আমান্তিতে(Casa dei Casti Amanti) প্রায় ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে – ৭৯ খ্রিস্টাব্দে এই ধরনের ম্যুরাল পাওয়া গেছে।

রেনেসাঁ যুগে ম্যুরাল চিত্রকলার বিশেষ বিস্তার ঘটে। শিল্পবোদ্ধারা এই চিত্রকলার প্রসারের জন্য বিশেষ উৎসাহী ছিলেন এবং ব্যয় করতেও পিছপা হতেন না।

প্রাচীন ভারতেও এই চিত্রকলার নিদর্শন আমরা দেখতে পাই অজন্তা গুহাচিত্রে।

 অজন্তা গুহার দেওয়াল ও ছাদে রচিত ম্যুরাল চিত্রকলা।

পরবর্তীকালে মেক্সিকান শিল্প আন্দোলনের সময় মেক্সিকান ম্যুরালিজমকে লিওনার্দো-দা-ভিঞ্চি ও মাইকেলএঞ্জেলোর মত জগত বিখ্যাত শিল্পীরা বিশেষভাবে প্রসারিত করেন।সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবধারা প্রচার করতে সেই সময় ম্যুরাল বিশেষ ভুমিকা পালন করে। "দ্য গ্রেট থ্রী" - দিয়েগো রিভিয়েরা, জোশ ক্লিমেন্ট অরোসকো ও ডেভিড আলফারো সিকিওরোস এই আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন।

প্রযুক্তিঃ

অঙ্কনের বহু শৈলী ও কৌশল আছে।যেমন —

১৬০০ খ্রী মেল্ক আব্বে-র এক ছাদে আঁকা ফ্রেস্ক

ফ্রেস্কো -

ইতালিয়ান শব্দ এফ্রেসস্কো থেকে যা ফ্রেস্কো শব্দটির উৎপত্তি যার অর্থ "তাজা"। এই পদ্ধতিতে দেওয়াল বা ছাদের [প্লাস্টারের উপর রং প্রয়োগ করা হয়।সর্বাধিক ব্যবহৃত ফ্রেস্কো পদ্ধতিতে ভিজে লাইমওয়াশের সঙ্গে জলে দ্রবণীয় রঙ ব্যবহার করা হয়, এই দ্রবনটি খুব তাড়াতাড়ি সম্পূর্ণ পৃষ্ঠতলে লাগিয়ে নেওয়া হয়, অথবা কখনো কখনো কিছু অংশে লাগানো হয়। শুকিয়ে গেলে রং হালকা হয়ে যায়।

ম্যান্টুয়ার প্যালাজ্জো ডেল টে - তে আঁকা গ্যালিলিও রোমানোর বুয়েন ফ্রেস্কো চিত্র

বুয়েনফ্রেস্কো পদ্ধতিতে রঙ জলে ভিজিয়ে, সিক্ত, টাটকা পাতলা লাইম মর্টার অথবা প্লাস্টারে লাগানো হয়।রঙ ভিজে প্লাস্টার দ্বারা শোষিত হয়। কয়েক ঘণ্টা পরে, প্লাস্টার শুকিয়ে যায় এবং বায়ুর সঙ্গে বিক্রিয়া করে: এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে রঙ প্লাস্টারের সঙ্গে আটকে যায়। এর ফলে চিত্রটি উজ্জ্বল এবং চমৎকার রং নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সংরক্ষিত থাকে।ষোড়শ শতকের শেষ নাগাদ "বুয়ন ফ্রেস্কো" পদ্ধতিটি বেশি ব্যবহার হতে থাকে, এবং গিয়ানব্যাতিস্তা টাইপোলো ও মাইকেল এঞ্জেলোর মতো চিত্রশিল্পীরা এর বহুল ব্যবহার করেন।

জব্বলপুরের শহীদ স্মারকে আঁকা বেওহার রামমনোহর সিনহার আঁকা ফ্রেস্ক-সেকো

ফ্রেস্কো সেকো পদ্ধতিতে শুকনো প্লাস্টারের ওপর চিত্র করা হয়। ইতালিয় ভাষায় "সেকো" শব্দের অর্থ "শুষ্ক"। এই ক্ষেত্রে পিগমেন্টগুলির আটকে থাকার জন্য কিছু মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা হয় ডিম- রঙিন প্রলেপের জন্য, আঠা এবংতেল ।

মেজো-ফ্রেস্কো পদ্ধতিতে প্রায় শুকনো প্লাস্টারে চিত্র আঁকা হয়, ষোড়শ শতাব্দীর লেখক ইগনাজিও পজো যাকে বলেছেন যে "একটি অঙ্গুষ্ঠ ছাপ না পড়ার মত যথেষ্ট শক্ত"। এতে রঙ প্লাস্টারের মধ্যে সামান্যই ঢোকে।

থাইল্যান্ডের টেম্পেরা ম্যুরাল চিত্র

টেম্পেরা ম্যুরাল চিত্রের প্রাচীনতম পদ্ধতিগুলির মধ্যে একটি। টেম্পেরাতে রঙ জলে পাতলা করে নেওয়া জন্য কোন অ্যালবুমিন মাধ্যম যেমন ডিমের সাদা বা কুসুম অংশে মেশানো হয়।টেম্পেরা চিত্রের স্থায়িত্ব অনেক বেশি হওয়ায় এর ব্যবহার বেশি হত। প্রায় ১৫০০ শতক অবধি এর ব্যবহার চলে আসার পর তৈল চিত্রের ব্যবহার শুরু হয়।

তাৎপর্যঃ

জনসাধারণের মধ্যে শিল্পচেতনা জাগ্রত করতে ম্যুরালগুলি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা গ্রহন করে। একটি ম্যুরালের যে আকার হয়, এবং তা তৈরিতে যে খরচ এবং কার্যক্ষমতা লাগে তার জন্য কোন সাহায্যদাতা ছাড়া ম্যুরালশিল্পীদের কাজ করা প্রায় অসম্ভব। স্থানীয় সরকার, কোন ব্যবসা থেকে সাহায্য পাওয়া বা পৃষ্টপোষকদের সাহায্যে ম্যুরাল তৈরী করা হয়। শিল্পীরা বিস্তৃত পরিসরের সেই সব দর্শকদের কাছে তাঁদের কাজ নিয়ে যেতে পারেন, যাঁরা শিল্প গ্যালারীতে পা রাখেন না। শিল্পের সৌন্দর্য দ্বারা একটি শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি হয়।একটি ম্যুরাল সামাজিক মুক্তির বা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের একটি অপেক্ষাকৃত কার্যকর হাতিয়ার হিসাবে অনেক সময়েই ব্যবহার করা হয়। এই রকম প্রচারের কাজে ব্যবহার করা হলেও তাদের এখনও কিছু শৈল্পিক মান আছে। লোকালয়ে ম্যুরাল লাগানো হলে পথচারীদের ওপর সচেতন বা অবচেতনভাবে ম্যুরালের একটি নাটকীয় প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যান্য বিশ্বখ্যাত ম্যুরালগুলি মেক্সিকো, নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, বেলফাস্ট, ডেরি, লস-অ্যাঞ্জেলেস, নিকারাগুয়া, কিউবা এবং ভারতে দেখতে পাওয়া যায়। দ্বন্ধের সময় এগুলি সামাজিক ও জাতিগতভাবে বিভক্ত সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসাবে কাজ করেছে। এগুলি সংলাপ শুরু করা ও চালানোর জন্য একটি কার্যকর উপায় হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে, অতএব বিভেদ মেটানোর এটি একটি সমাধান হতে পারে।

অনন্তশয্যায় বিষ্ণু

শিব তাণ্ডব ম্যুরাল চিত্র

ভারতের কেরলে কিছু বিশেষ রকম ম্যুরাল আছে। কেরলের মন্দিরের দেওয়ালে বিশেষ ধরনের ম্যুরাল চিত্র রয়েছে। সেগুলি খ্রিস্ট পরবর্তী নবম শতকের হতে পারে।

আয় বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে পর্যটন আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য অনেক গ্রামীণ শহর ম্যুরাল ব্যবহার শুরু করেছে। এমন একটি শহর হল ক্যালকিট, জর্জিয়া। ২০১০ এর গ্লোবাল ম্যুরাল কনফারেন্স আয়োজন করার জন্য ক্যালকিটকে নির্বাচন করা হয়েছিল। শহরে বারোটি ম্যুরাল তৈরী সম্পন্ন হয়েছে।

সম্প্রতি গ্রাফিতি এবং খোলা রাস্তায় এই শিল্প সমসাময়িক দেওয়াল চিত্রকলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।কিথ হ্যারিং, অ্যাবভ, সার্ফ ও ফেইলি প্রমুখ গ্রাফিতি শিল্পীরা শহুরে ভূদৃশ্য অতিক্রম করে, ব্যক্তিগত এবং কর্পোরেট খরিদ্দারের কাছে তাঁদের শিল্পকে সফলতার সঙ্গে নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। গ্রাফিতি শিল্প ১৯৯০ এর দশকের শেষের দিকে আরও মূলধারায় মিশে যাচ্ছিল। যুব-ভিত্তিক দল যেমন নাইকি এবং রেড বুল, উইডেন কেনেডি, গ্রাফিতি শিল্পীদের দিয়ে তাদের নিজ নিজ অফিসের দেওয়াল সাজিয়ে নিয়েছিল। এই প্রবণতা ২০০০ সাল জুড়ে অব্যাহত ছিল এবং গ্রাফিতি শিল্প বিশ্বব্যাপী শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে আরো স্বীকৃতি অর্জন করে।

ইদানিং পাথর, সিরামিক, চীনামাটির বাসন, গ্লাস এবং ধাতু দিয়ে তৈরী টালিগুলি বাড়ির ভিতর বা বাইরের দেওয়ালে বসিয়ে ম্যুরালে রূপান্তরিত করা হয়। এগুলি মেঝেতেও বিছানো চলে। ম্যুরাল টাইলগুলি সাধারণত আঁকা, গ্লেজড, পাথর থেকে টুকরো টুকরা বা ভাঙ্গা হয়।

মোজাইক ম্যুরালগুলি ছোট আকারের ১/৪" থেকে ২" আকারের রঙিন পাথর, সিরামিক, বা কাচের টাইল মিশ্রিত করে তৈরি করা হয় যা পরে একটি ছবির আকার পায়। বাণিজ্যিক মোজাইক ম্যুরাল নির্মাতারা আধুনিক দিনের প্রযুক্তিতে কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহার ক'রে ছবিগুকে রঙে আলাদা করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে জালের চাদরের উপর লাগিয়ে দেয় এবং ম্যুরালগুলি নিখুঁতভাবে দ্রুত এবং প্রচুর পরিমাণে তৈরি করে।

কিছু বিখ্যাত শিল্পীর আঁকা ম্যুরাল দিলাম ।

            সান বারতেলো ম্যুরাল

জিওত্ত-র আঁকা অ্যারেনা চ্যাপেলের ম্যুরাল " ব্যাপ্তিসম অফ ক্রাইস্ট" 

মাইকেলেঞ্জেলো-র আঁকা " বার্থ অফ অ্যাডাম "

লিওনারদ দা ভিঞ্চির "দ্য লাস্ট সাপার" 


অজন্তা গুহার কিছু ম্যুরাল চিত্র


শ্রীলঙ্কার কিছু ম্যুরাল



        চিত্র সৌজন্যঃ উইকিপিডিয়া ও আন্তরজাল 
c



আমরা সবাই প্রতিভারে করে পণ্য

ভাবালু আত্মকরুণায় আছি মগ্ন

আমাদের পাপের নিজের জীবনে জীর্ণ

করলে, যামিনী রায়

… পুঁথি ফেলে তুমি তাকালে আপন গোপন মর্মতলে

ফিরে গেলে তুমি মাটিতে, আকাশে, জলে

স্বপ্ন লালসে অলস আমরা তোমার পুণ্যবলে

ধন্য যামিনী রায়

 – বুদ্ধদেব বসু






 

যে শিল্পী নিজেকে স্বতন্ত্র রেখেছেন, নিজের প্রতিভাকে পণ্য করে নয়, কোনো পরসংস্কৃতির চর্চা করে নয়, বরং স্বদেশের প্রত্যন্ত অবহেলিত লোকসংস্কৃতিকে তুলির আঁচড়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি দিয়েছেন, তিনিই পটুয়া যামিনী রায়। শুধুমাত্র দেশপ্রেমের টানে, নিজস্বতাকে ধরে রাখার অভিপ্রায়ে তিনি পটচিত্রের একটি আন্তর্জাতিক মান ঠিক করে দিয়ে গেছেন। তাই বুদ্ধদেব বসু কবিতায় এভাবেই স্তুতি গেয়েছেন শিল্পী যামিনী রায়ের।


নিজ স্টুডিওতে যামিনী রায়


বঙ্গীয় চিত্রশিল্পীদের মধ্যে অগ্রগন্য ও স্বনামধন্য শিল্পী হলেন যামিনী রায়। জন্ম ১১ এপ্রিল ১৮৮৭। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড় গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম রামতরণ রায়। মাতার নাম নগেন্দ্রবালা দেবী।শিল্পী পিতার সংস্পর্শে থেকে ছোট থেকেই যামিনী রায়ের মধ্যে ছবি আঁকার শিল্পীসত্ত্বা দেখা যায়। শৈশবে ঘরের দেয়ালে, মেঝেতে কিংবা হাতের কাছে যা-ই পেতেন, তাতেই পুতুল, হাতি, বাঘ, পাখি ইত্যাদি এঁকে গেছেন নিজের মনে। গ্রামে দুর্গাপূজোর সময় নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দৌড়ে যেতেন ঠাকুর গড়া দেখতে।


শিল্প সৃষ্টিতে মগ্ন যামিনী রায়


তিনি ১৬ বছর বয়সে কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হন।শিক্ষক হিসাবে পেয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। ব্রিটিশ-শাসিত ভারতবর্ষে আর্ট স্কুলে ইউরোপীয় অ্যাকাডেমিক রীতিতেই চিত্রকলায় শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। আর্ট স্কুলে ইতালীয় শিল্পী গিলার্দি ও পরে অধ্যক্ষ পার্সি ব্রাউনের সংস্পর্শে এসে তিনি প্রাচ্য-প্রতীচ্যের উভয় শিল্পের কলা-কৌশলের সাথে পরিচিত হন। পাশ্চাত্য রীতির চিত্রকলা তাকে আকৃষ্ট করে এবং ফলস্বরূপ তিনি তাতে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন। পাশ্চাত্যের বিখ্যাত পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পী পল সেজান, ভ্যান গগ, পাবলো পিকাসো ও গগ্যাঁর প্রভাব দেখা যায় তার চিত্রকলায়।পোট্রেইট, ল্যান্ডস্কেপ, তৈলচিত্র ছিল তার স্টাইল ও মাধ্যম। এছাড়াও ক্লাসিক্যাল ন্যুড পেইন্টিংয়ে তার হাত ছিল প্রশংসনীয়। নিজস্ব ঢঙে তিনি এঁকে গিয়েছেন তার মতো করে।১৯১৪ সালে ফাইন আর্টে তিনি ডিপ্লোমা প্রাপ্ত হন।


চিত্রকলার ভাবধারার পরিবর্তনঃ

হঠাৎই তিনি পাশ্চাত্য শিল্পে আগ্রহ হারাতে থাকেন, এরপর থেকে তার আঁকার বৈশিষ্ট্য, ধরন, বিষয়বস্তু, তুলির ব্যবহার ক্রমেই বদলাতে থাকে।পাশ্চাত্য ঘরানার চিত্রে যদিও তাঁর প্রতিভা প্রশংসার দাবী রাখছিল তাও নিজে তাতে সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। নিজের আঁকা ছবিতে কিছুর অভাব বোধ করছিলেন যা তাঁকে গভীর ভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল। তা হল নিজস্বতা, স্বকীয়তা, দেশপ্রীতি। ছবিতে অনুপস্থিত ছিলো দেশীয় সংস্কৃতি, স্বদেশের মানুষ, তাদের জীবনাচার ও প্রকৃতি — কোনো উপাদানই উপস্থিত ছিল না পাশ্চাত্য চিত্রে। আর তাই প্রান্তিক জায়গা থেকে শিল্পের লোকায়ত ধারাই শিল্পীকে আকৃষ্ট করলো সবথেকে বেশি। মাটির টানে ঘরে ফিরে গেলেন যামিনী রায়। নিজস্ব ভারতীয় তথা বাঙালি ভাবধারার জন্য গর্বিত বোধ করতেন।তাই শত আমন্ত্রনেও বিদেশে যেতে রাজী হননি তিনি।


শ্রীকৃষ্ণের কালিয়া নাগ দমন

১৯২৫ সালের কাছাকাছি সময়। কালীঘাট মন্দিরের আশপাশে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ পটচিত্রগুলোর উপরে চোখ পড়ল তরুণ শিল্পী যামিনী রায়ের। কালী চরিত্র এবং কাহিনি তুলির টানে, উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারে নিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। যেন ধাক্কা খেলেন। ‘ইম্প্রেশনিজম’ এবং ‘কিউবিজম’-উত্তর সময়ে শিল্পের এই সারল্য তাঁকে মুগ্ধ করল। খুঁজে পেলেন,যা খুঁজছিলেন এত দিন ধরে।কালীঘাট চিত্রকলা, অর্থাৎ ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা শহরে কালীঘাটের কালীমন্দিরের সন্নিহিত এলাকার মন্দিরকে কেন্দ্র করে হাট-বাজার গড়ে উঠেছিলো। কালীমন্দিরে যে তীর্থযাত্রীরা আসতেন, ফেরার পথে স্মারক হিসেবে স্মৃতিচিহ্নমূলক বস্তু সঙ্গে নিয়ে যেতেন। কালীঘাটের কালীমন্দিরের সাথে সংযুক্ত থাকার কারণে স্মারক হিসেবে কালীঘাট চিত্রকলার উদ্ভব ঘটেছিল। চিত্রকলার বিষয় ছিল পৌরাণিক, ধর্মীয় অথবা পশুপাখি জাতীয় গ্রামীণ চিত্র। এগুলোই স্থানীয়রা নিজস্ব রঙে-ঢঙে আঁকতেন, যা কালীঘাট চিত্রকলা নামে বিখ্যাত ছিল। এমন করে শুধু কালীঘাট নয়, জন্মস্থান বেলিয়াতোড়, ওড়িষ্যা, প্রাচীন গুজরাট, মেদিনীপুর ঝাড়গ্রাম থেকেও প্রচুর পট সংগ্রহ করেন যামিনী রায়।


গনেশ কোলে দুর্গা মা


এরপর বেঙ্গল স্কুল ও প্রচলিত পশ্চিমা ধারার বিপরীতে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক শিল্পধারার জন্ম দেন তিনি। পটুয়াদের থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য তৈরি করলেন পটচিত্রের। দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ এই শিল্পী স্বদেশের লোকায়ত শিল্পকে বেছে নিলেন নিজস্ব ঘরানা হিসেবে। দৈনন্দিন গ্রাম্য জীবনের সহজ স্বাভাবিক দিকটায় ঝুঁকে পড়লেন। গ্রামীণ জীবন-জীবিকা, লাঙল হাতে চাষী, কীর্তন গায়ক, কিশোরী কন্যাদের হাসি, ঘরোয়া বধূ, বাঁশীবাদক ক্লান্ত পথিক, নৃত্যরত তরুণীদ্বয়, বাঘ, মাছ, বিড়াল, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রভৃতি হলো তার অঙ্কনের বিষয়াদি। পটচিত্রের উপাদানে আরও রসদ যুগিয়েছে প্রিয় ধর্মকাহিনীগুলো। যেমন- রামায়ণ কথা, চৈতন্যের জীবনী, ক্রুশবিদ্ধ যীশুর জীবন, রাধা-কৃষ্ণ, জগন্নাথ-বলরাম ইত্যাদি। যামিনী রায়ের আঁকিয়ের পটপরিবর্তনের বিষয়টিতে শিল্প বিশ্লেষক ড. অশোক ভট্টাচার্য্য মূল্যবান মন্তব্য করেছেন,

তিনি একজন জাত পটুয়ার মতো গুণগত উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে ছবির সংখ্যাগত আধিক্যের দিকেও নজর দিয়েছেন।

সাঁওতাল চিত্র

বেলিয়াতোড় গ্রামের আশেপাশেই ছিল সাঁওতাল আদিবাসীদের বসবাস। যামিনী রায় ১৯২১ থেকে ১৯২৪-এর মধ্যকার সময়ে নতুন এক গবেষণা চালালেন সাঁওতাল আদিবাসীদের নিয়ে। তাদের জীবনাচারকে তিনি তুলির রঙে নতুন করে দেখবেন বলে ঠিক করলেন। সেখানে স্থান পেলো সাঁওতাল নারীদের নাচ, পরিবার, জীবনযাপনের দৃশ্যসহ দৈনন্দিন জীবনের রূপ।


সাঁওতাল রমণী


সিদ্ধান্ত নিলেন, বাংলার লোকশিল্পকেই পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করবেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বঙ্গশিল্প জগতের তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক খুলে গেল।প্রথমত, দৈনন্দিন বঙ্গজীবন অতি সহজেই ধরা দিল শিল্পীর তুলিতে। দ্বিতীয়ত, এই সহজবোধ্য শিল্প সহজলভ্য হয়ে উঠল বঙ্গবাসীর কাছে। পৌঁছে গেল মধ্যবিত্তের অন্দরে। তৃতীয়ত, পুনরুজ্জীবিত হল বাংলার লোকশিল্প।



চিত্রকলার বৈশিষ্টঃ

দীর্ঘ অনুশীলনের পর তিনি নিজস্ব অঙ্কন শৈলী তৈরি করেন। প্রায় পঞ্চাশ বছরের চিত্রকলার চর্চায় তাঁর নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট ছিলঃ

  • গ্রাম বাংলার সহজ সরল মানুষ, তাদের দৈনন্দিন অনাড়ম্বর জীবন যাত্রা, পশুপাখী প্রভৃতিকে তাঁর ছবির বিষয় হিসাবে গ্রহন করেছিলেন।
  • ছবি যাতে সহজলভ্য হয় তাই ছবি আঁকার উপকরন হিসাবে খড়িমাটি, ভুসোকালি, বিভিন্ন গাছগাছালি, লতাপাতার রস থেকে আহরিত রং ব্যবহার করতেন। তার সকল চিত্র যেন জীবন্ত হয়ে উঠতো দেশীয় উপাদানে আর রঙে। তিনি সবকিছুতেই দেশীয়ই উপাদানের সাহায্য নিয়েছিলেন, যাতে ধনী-নির্ধন সবার কাছে অনায়াসেই পৌঁছুতে পারেন। তিনি প্রচুর ছবি এঁকেছেন সাধারণের জন্য। খুবই স্বল্পমূল্য ও সহজলভ্যও ছিল চিত্রগুলো।
  • রঙের ব্যবহার যামিনী রায়কে সবচেয়ে বেশি পৃথক করেছে সকল চিত্রশিল্পীদের থেকে। উজ্জ্বল রঙে ফুটে থাকা তার চিত্রগুলো যেন কোনো উৎসবের আমেজ বয়ে আনে। পটুয়াদের মতো তিনিও মেটে রঙে ছবি এঁকেছেন।
  • তার আঁকার একটি বিশেষ কৌশল ছিল। বেশ ক’টি ছবি খেয়াল করলে দেখা যাবে, তিনি চোখের কাজে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। লম্বা বড় সরু নয়নের আধিক্য যেকোনো ছবিতে। সেই চোখ হোক পুরুষের, বিড়ালের অথবা সুনয়না যুবতীর, উপেক্ষা করার উপায় নেই। মোটা দাগে স্পষ্ট ও সপ্রতিভ হয়ে ওঠে সাঁওতাল পটচিত্রগুলো। তাঁর ছবিতে সাবজেক্টই প্রধান, পশ্চাতপট নয়।
  • পটচিত্র আঁকার সময় তিনি সমতলীয় বর্ণিল পট ব্যবহার করতেন। এই চিত্রশৈলীকে তিনি "ফ্ল্যাট টেকনিক" নাম দিয়েছিলেন। তবে সেই সময় বাংলা চিত্রকলার ক্ষেত্রে বেঙ্গল স্কুলের একাধিপত্য থাকায় এই শৈলী সমাদৃত হয় নি।

সীতার অগ্নীপরীক্ষা


১৯১৮-১৯১৯ সালে ইন্ডিয়ান "একাডেমী অফ ফাইন আর্টস"-পত্রিকায় তাঁর আঁকা চিত্র প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া স্ট্রীটে তাঁর প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয়। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতে আগত মার্কিন সৈনিক ও অফিসার বৃন্দ যামিনী রায়ের চিত্র বেশি দামে কিনতে শুরু করলে তাঁর আঁকা চিত্রের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এরফলে আন্তর্জাতিক মহলেও তাঁর চিত্র প্রশংসিত হয়। ভারতের মাটি ছাড়িয়ে তাঁর আঁকা চিত্র ব্রিটেন, আমেরিকা, প্যারিস, ইউরোপেও প্রদর্শিত হয়। বিদেশের অনেক গ্যালারীতে তাঁর আঁকা চিত্র শভা পায়। লন্ডনের ভিক্টোরিয়া এবং আলবার্ট মিউজিয়ামে তার চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে।


সাঁওতাল মা ও ছেলে

পূজারিণী মেয়ে

রাধা- কৃষ্ণ

কীর্তন

ক্রন্দসী মাছের সাথে দুই বিড়াল

যিশুখ্রিষ্ট

তার আঁকা বিখ্যাত ছবির মধ্যে রয়েছে ‘সাঁওতাল মা ও ছেলে’, ‘চাষির মুখ’, ‘পূজারিণী মেয়ে’, ‘কীর্তন’, ‘বাউল’, ‘গণেশ জননী’, ‘তিন কন্যা’, ‘যিশুখ্রিষ্ট’, ‘কনে ও তার দুই সঙ্গী’ ও ‘ক্রন্দসী মাছের সাথে দুই বেড়াল’।

কর্মরত কামার


শিল্পকর্মের স্বীকৃতির জন্য তিনি ১৯৫৪ সালে পদ্মভূষণ পান। ১৯৫৫ সালে চিত্রশিল্পের সর্বচ্চ সন্মান "ললিত কলা একাডেমী" পুরস্কার যা তিনিই সর্বপ্রথম পান। ১৯৫৬ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি-লিট ডিগ্রি লাভ করেন।১৯৩৪ সালে যামিনী রায় তার আঁকা একটি চিত্রকর্মের জন্য 'ভাইসরয় স্বর্ণপদক' পান।

বরেণ্য চিত্রকর যামিনী রায় ১৯৭২ সালের ২৪ শে এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।

এই প্রসঙ্গে যামিনী রায়ের সাথে সেই সময়ের যে সকল গুনীজনের সাক্ষাৎ হয়েছিল তা একটু ছোট করে বলি।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং যামিনী রায়



যামিনী রায় রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-শিল্পকর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তাই দেখা যায়, যামিনী রায়ই একজন আধুনিক শিল্পী, যিনি রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা বিষয়ে লিখিতভাবে প্রথম প্রতিবেদন রেখেছেন। এই লেখা বুদ্ধদেব বসু-সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার রবীন্দ্র সংখ্যায় (আষাঢ়, ১৩৪৮) প্রকাশিত হয়। কবিতা পত্রিকায় যামিনী রায় প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রনাথের ছবি’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি পড়ে বড় আনন্দ পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। স্বয়ং কবি চিঠি লিখে যামিনীকে জানিয়েছিলেন সে কথা। সেই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,

তোমাদের মতো গুণীর সাক্ষ্য আমার পক্ষে পরম আশ্বাসের বিষয়।… আমার স্বদেশের লোকেরা আমার চিত্রশিল্পকে যে ক্ষীণভাবে প্রশংসার আভাস দিয়ে থাকেন আমি সেজন্য তাদের দোষ দিই নে। আমি জানি চিত্র দর্শনের যে-অভিজ্ঞতা থাকলে নিজের বিচারশক্তিকে কর্তৃত্বের সঙ্গে প্রচার করা যায়, আমাদের দেশে তার কোনো ভূমিকাই হয়নি। সুতরাং চিত্রসৃষ্টির গূঢ় তাৎপর্য বুঝতে পারে না বলেই মুরুব্বিয়ানা করে সমালোচকের আসন বিনা বিতর্কে অধিকার করে বসে। সেজন্য এদেশে আমাদের রচনা অনেক দিন পর্যন্ত অপরিচিত থাকবে। আমাদের পরিচয় জনতার বাইরে, তোমাদের নিভৃত অন্তরের মধ্যে। আমার সৌভাগ্য, বিদায় নেবার পূর্বেই নানা সংশয় এবং অবজ্ঞার ভিতরে আমি সেই স্বীকৃতি লাভ করে যেতে পারলুম, এর চেয়ে পুরস্কার এই আবৃতদৃষ্টির দেশে আর কিছু হতে পারে না।


যামিনী রায়কে রবীন্দ্রনাথ আরও একটি অসাধারণ চিঠি লিখেছিলেন, যা বহুপঠিত এবং বহুচর্চিত। যেখানে আধুনিক দৃশ্যকলার একেবারে গোড়ার কথাটি নিঃসংকোচে ঘোষণা করেছিলেন তিনি। সে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,

ছবি কী– এ প্রশ্নের উত্তর এই যে– সে একটি নিশ্চিত প্রত্যক্ষ অস্তিত্বের সাক্ষী। তার ঘোষণা যতই স্পষ্ট হয়, যতই সে হয় একান্ত, ততই সে হয় ভালো। তার ভালো-মন্দের আর কোনো যাচাই হতে পারে না। আর যা কিছু – সে অবান্তর – অর্থাৎ যদি সে কোনো নৈতিক বাণী আনে, তা উপরি দান।

রবীন্দ্র-চিত্রকলা বিষয়ে যামিনী রায়ের প্রবন্ধ এবং উত্তরে রবীন্দ্রনাথের চিঠির মধ্যে দিয়ে সেই সময়ের অন্যতম দুই আধুনিক শিল্পীর মুক্ত ভাবনার আদান-প্রদান হতো এভাবেই।



যামিনী রায় এবং বিষ্ণু দে

একটা টেবিলে সেই তিন চার ঘণ্টা চারমিনার ঠোঁটে জ্বলত
কখনো বিষ্ণু দে, কখনো যামিনী রায় এই নিয়ে তর্কটা চলত


মান্না দে'র বিখ্যাত ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানের বেশ পরিচিত দু'টি লাইন। কলকাতার সেই প্রিয় কফি হাউজে বন্ধুদের আড্ডার বিষয় হতো কখনো বিষ্ণু দে, কখনো যামিনী রায়। তারা দুজন ছিলেন দীর্ঘ এবং আমৃত্যু বন্ধু। ১৯২৮ বা ’২৯ সালে বিষ্ণু দে প্রথম যামিনী রায়ের আনন্দ চ্যাটার্জী লেনের বাগবাজার বাড়িতে যান অজয় সেনের সাথে চিত্র প্রদর্শনী দেখতে। এরপর থেকে তিনি নিয়মিত দর্শক হয়েছিলেন শিল্পীর। যামিনী রায়ও হরহামেশা আড্ডা দিতে যেতেন বিষ্ণু দে'র দক্ষিণ কলকাতার ভাড়া বাড়িতে। সেই আড্ডায় আরও সঙ্গী হতেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। আড্ডার তর্ক-বিতর্কেও তুলি-কলম দিয়ে ছবি আঁকতেন শিল্পী যামিনী রায়।


বিষ্ণু দে'কে লেখা যামিনী রায়ের চিঠি এবং যামিনী রায়ের করা প্রচ্ছদে বিষ্ণু দের কবিতার বই


১৯৫৯-এর ২১ জুন কবি বিষ্ণু দে ‘তাই তো তোমাকে চাই’ কবিতায় শিল্পী যামিনী রায়কে নিয়ে লিখেছেন নিম্নের পংক্তিগুলি,

একটিই ছবি দেখি, রঙের রেখার দুর্নিবার একটি বিস্তার
মুগ্ধ হয়ে দেখি এই কয়দিন, অথচ যামিনীদার
প্রত্যহের আসনের এ শুধু একটি নির্মাণ একটি প্রকাশ
হাজার হাজার রূপধ্যানের মালার একটি পলক
যেখানে অন্তত গোটা দেশ আর কাল, একখানি আবির্ভাব


যামিনী রায়ও প্রায় তার আঁকা ছবি উপহার দিতেন বিষ্ণু দেকে। কবিবন্ধু বিষ্ণুর বইয়ের প্রচ্ছদও এঁকে দিয়েছেন যামিনী। তারা নিয়ম করে চিঠি আদান-প্রদান করতেন। শেষ বয়সে যখন তারা প্রতিবেশি, তখন প্রায় প্রত্যহ আসা-যাওয়া চলতো। দুজন একসাথে ধূমপান করতেন এবং অন্তরঙ্গ আলাপে ডুবে থাকতেন। বয়সে ২২ বছরের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তাদের বন্ধুত্ব ছিল সমবয়স্কদের মতোই।

বাঙালির বাঙালিত্ব তুলে ধরতে মাছ-মিষ্টি-দই এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি রয়েছে যামিনী রায়ের নাম। তার পটচিত্রে উঠে এসেছে ষোল আনা বাঙালিয়ানা। যামিনী রায় ছিলেন আর দশজনের চেয়ে আলাদা, কারণ তিনি তার পটুয়াশৈলীর কারণে নিজের বিশেষত্ব অটুট রেখেছেন। প্রতি বছর দূর্গাপূজোয় কোনো না কোনো মণ্ডপের নকশা তৈরি করা হয় যামিনী রায়ের চিত্রশৈলী অনুসরণ করে।

শেষে যামিনী রায়ের আঁকা আরো কিছু চিত্র।







চিত্র সৌজন্যঃ আন্তর্জাল
তথ্য সূত্রঃ উইকিপিডিয়া 

k


পুরাতন পোস্টসমূহ হোম

আমার কথা

বেশ কিছু পথ পার হয়ে আসা জীবনের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার থেকে কিছু মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি। সাথী বর্তমান ও আগামী দিনের পরিকল্পনা।.


জানা-অজানা

অনুসরণকারী

বিভাগ

  • অনুগল্প 6
  • গল্পকথা 10
  • চিত্রকলা 2
  • নারীর জগৎ 6
  • বইপত্র 6
  • রান্নাঘর 5
  • শিশুর জগৎ 6
  • স্ব-উন্নয়ন 5

.

BLOGGER দ্বারা পরিচালিত

Designed by OddThemes | Distributed by Gooyaabi Templates